জালের বাক্সে আটকে রাখা মশার ওপর ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

একটি ছোট্ট মশা, অথচ আমাদের জীবনের জন্য কত বড় এক নীরব ঘাতক! প্রতিদিন কত মানুষ এই ছোট্ট পতঙ্গের কামড়ে হাসপাতালে ছুটছেন, কত পরিবার তাদের প্রিয়জন হারাচ্ছেন। এই ডেঙ্গু আর মশাবাহিত রোগের আতঙ্ক থেকে নগরবাসীকে একটু স্বস্তি দিতে, একটু নিরাপদে রাখতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ঠিক এভাবেই, মশার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু জোরালো যুদ্ধের সাক্ষী হলো বুধবারের গাবতলী।

নগরবাসীর ওপর প্রয়োগ করার আগে, মশা মারার ওষুধ ঠিক কতটা কার্যকরী—তা নিশ্চিত করতে এক অভিনব ও শ্বাসরুদ্ধকর পরীক্ষার আয়োজন করেছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিইটের টুকরোয় লেখা লটারি: ড্রাম বাছাইয়ের অদ্ভুত দৃশ্য

বুধবার বিকেলে গাবতলীতে ডিএনসিসির কাঁচাবাজার সংলগ্ন নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ভবনের সামনে সারিবদ্ধভাবে সাজানো শত শত নীল রঙের ড্রাম। প্রতিটি ড্রামের ভেতরে যেন লুকিয়ে আছে নগরবাসীর শান্তির ঘুম!

  • ডিএনসিসির প্রধান ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান জানালেন এক বিশাল প্রস্তুতির কথা। উড়ন্ত মশা নিধনের জন্য ঠিকাদারকে মোট ৬ লাখ লিটার ‘ম্যালাথিয়ন’ সরবরাহের কার্যাদেশ দেওপ্রথম ধাপে এসেছে ২ লাখ লিটার ওষুধ।

২০০ লিটারের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন প্রায় এক হাজার ড্রামে বন্দি আছে এই তরল হাতিয়ারকিন্তু এতগুলো ড্রাম থেকে পরীক্ষার জন্য কোনটিকে বেছে নেওয়া হবে? এখানেই দেখা গেল স্বচ্ছতার এক অনন্য নজির। কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক কে এম কাওছার হোসেন দূর থেকে ছুড়ে মারলেন একটি ইটের টুকরো। যে ড্রামটির গায়ে ইটটি গিয়ে পড়ল, সেটিকেই পরীক্ষার প্রথম নমুনা হিসেবে খুলে নেওয়া হলো!।

চার ফুট দূর থেকে ফগার মেশিন থেকে বাক্সের ওপর ধোঁয়া প্রয়োগ করতে হয়। চলছে সেই মাপজোক

যাদের হাতে পরীক্ষার ভার

  • ঠিক একইভাবে ইটের টুকরো ছুড়ে আরও দুটি ভিন্ন ড্রাম বাছাই করা হলো। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি নিজ হাতে করলেন:মাইনুল হাসান (মেডিক্যাল অফিসার, আইইডিসিআর)

আবুল হাসনাত মোহাম্মদ আশরাফুল আলম (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ডিএনসিসি)শ্বাসরুদ্ধকর ২০ মিনিট: খাঁচাবন্দি মশা ও ধোঁয়ার আঘাত

জাল দিয়ে ঘেরা চারকোনা ৯টি বাক্স। প্রতিটি বাক্সে বন্দি ৫০টি করে কিউলেক্স মশা। বাছাই করা তিনটি ড্রামের নমুনা ভরা হলো তিনটি আলাদা ফগার মেশিনে।

এরপর শুরু হলো আসল যুদ্ধ! মশককর্মীরা ঠিক যেভাবে পাড়ায় পাড়ায় হেঁটে ওষুধ ছিটান, ঠিক সেভাবেই মাত্র চার ফুট দূর থেকে প্রতিটি বাক্সে একবার করে ধোঁয়া দেওয়া হলো। শুরু হলো অপেক্ষার প্রহর। ঘড়ির কাঁটায় সময় মাপা হলো ঠিক ২০ মিনিট। এই ২০ মিনিট যেন ছিল এক অদৃশ্য রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের সময়।

সময় শেষ হতেই দেখা গেল এক অদ্ভুত স্তব্ধতা! প্রথম নমুনার তিনটি বাক্সের দুটিতে থাকা সব মশাই নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। দু-একটি শুধু মৃত্যুর প্রহর গুনছে, সামান্য নড়াচড়া করছে। তবে অবাক করা বিষয় হলো, একটি বাক্সে তখনও দুটি মশাকে উড়তে দেখা গেল! অন্যদিকে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় নমুনার ৬টি বাক্সের প্রতিটি মশাই ধোঁয়ার আঘাতে পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়েছে। একেই বিজ্ঞানের ভাষায় গ্লুকোজের বাটি ও ২৪ ঘণ্টার দীর্ঘ অপেক্ষা

২০ মিনিটের এই দৃশ্যই কিন্তু শেষ কথা নয়! ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানালেন এক গভীর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার কথা। ওষুধটি আসলেই কতটা প্রাণঘাতী, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে অপেক্ষা করতে হবে ২৪ ঘণ্টা।

বৃহস্পতিবার বিকেলে করা হবে ‘মর্টালিটি টেস্ট’ বা মশার মৃত্যুর চূড়ান্ত হিসাব। এই ২৪ ঘণ্টা মশাগুলোকে আলাদা কক্ষে রাখা হবে এবং তাদের বেঁচে থাকার লড়াই দেখার জন্য খাঁচায় দেওয়া হয়েছে গ্লুকোজ মিশ্রিত খাবার! পাশাপাশি, পরীক্ষার ফলাফল তুলনা করার জন্য রাখা হয়েছে ৩টি ‘নিয়ন্ত্রণ খাঁচা’, যেখানে কোনো ওষুধ দমানুষের জীবনের নিরাপত্তায় তিন স্তরের ঢাল

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য দিলেন। তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা মেনেই চলছে এই পরীক্ষা। আর সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো—এই মশাগুলো ঢাকার নয়! ঢাকার মশাগুলো আগে থেকেই ওষুধের ধোঁয়া খেয়ে অভ্যস্ত, তাই ওষুধের আসল কার্যকারিতা বুঝতে লার্ভা অবস্থায় এগুলো ঢাকার বাইরে থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের এই পরীক্ষা শেষে নমুনাগুলো আরও দুটি কঠিন পরীক্ষায় অবতীরআইইডিসিআর (IEDCR): এখানে ল্যাবরেটরিতে ওষুধের বায়ো-ইফিক্যাসি বা জৈব-কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।২.উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই ল্যাবে দেখা হবে ওষুধের রাসায়নিক গঠন ও সক্রিয় উপাদান সঠিক আছে কি না।

এই তিন স্তরের কঠিন পরীক্ষায় পাস করলেই কেবল ওষুধটি আপনার-আমার চারপাশের বাতাসে ছিটানো হবে।

বাক্সগুলোর ভেতরে দেওয়া হচ্ছে গ্লোকোজ মিশ্রিত খাবার। 

আমাদের শিক্ষণীয়: জীবনের মূল্য ও বিশেষ সতর্কতা

কর্তৃপক্ষ তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে আমাদের নিরাপদ রাখার জন্য, কিন্তু আমাদের নিজেদের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব সবার আগে আমাদের নিজেদেরই। মশা মারার ওষুধ হয়তো সাময়িক স্বস্তি দেবে, কিন্তু আপনার বাড়ির আঙিনায়, ছাদে বা ফুলের টবে জমে থাকা এক ফোঁটা পরিষ্কার পানিই হতে পারে আপনার পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ। একটি মশার কামড় শুধু চুলকানি নয়, এটি একটি জীবনের সমাপ্তি ডেকে আনতে পারে। তাই আসুন, সিটি করপোরেশনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে, আমরা নিজেরাও একটু সচেতন হই। বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখি, মশারি টানিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করি। কারণ, আপনার জীবনের মূল্য আপনার পরিবারের কাছে পৃথিবীর যেকোনো সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি।